করোনা ও আমাদের যা করণীয়

ডা: খোন্দকার আসাদুজ্জামান কনসালটেন্ট, আজগর আলী হাসপাতাল, ঢাকা।

করোনা ভাইরাস একটি অতি ক্ষুদ্র আরএনএ(RNA)প্রজাতির সংক্রামক অণুজীব।ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে ভাইরাসটি দেখতে মুকুটের মতো,তাই ল্যাটিন শব্দ করোনা (যার অর্থ মুকুট)হতে এর নামকরণ করা হয় করোনা ভাইরাস। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশিতে সৃষ্ট অতি ক্ষুদ্র বায়ুবাহিত পানি কণা বা জীবাণু বহনকৃত হাতের স্পর্শে সহজেই ভাইরাসটি অন্য সুস্হ ব্যক্তির শ্বাসনালিতে সংক্রমিত হয়।এই সংক্রমনণর লক্ষণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাধারণ সর্দি-কাশির মতোই মনে হয়,অর্থাৎ হালকা জ্বর,শুষ্ক কাশি,গলা ব্যথা,নাকে পানি পড়া,পেটের অসুখ বা অবসাদ লাগতে পারে।অল্প সংখ্যক রোগীর ক্ষেত্রে ফুসফুসের মারাত্মক সংক্রমন যেমন নিউমোনিয়া,এআরডিএস(ARDS)বা তীব্র শ্বাসকষ্ট,এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।রোগের এই উপসর্গগুলো প্রকাশিত হতে গড়ে পাঁচ দিন সময় লাগে এবং আক্রান্ত ব্যক্তি কোন প্রকার লক্ষণ ছাড়াও ১৪ দিন পর্যন্ত অন্যকে সংক্রমন করতে পারে। করোনা ভাইরাসে কোন ব্যক্তি আক্রান্ত কিনা নিশ্চিত হতে হলে উক্ত ব্যক্তির নাক বা গলার ভিতর থেকে swab নিয়ে PCR ল্যাবে/ভাইরোলজি বিভাগে (যেমন-IEDCR,ICDDR&B)পাঠিয়ে RT-PCR পরীক্ষা করে ভাইরাসটি শনাক্ত করা যেটি আমাদের মতো গরীব দেশে ইচ্ছা করলেই যে কোন রোগী করতে পারবেনা বা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগীদের হাতের নাগালেও নয়।তাই বলছি,সর্দি-কাশি থাকলে এবং কিছু সহজলভ্য পরীক্ষার মাধ্যমে আমরা দেশের যে কোন প্রান্ত থেকে রোগী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত কিনা সেটা নির্ণয় করতে পারব।পরীক্ষাগুলোর মধ্যে WBC স্বাভাবিক মাত্রায় থাকা বা কমহওয়া,লিম্ফোপেনিয়া(Lymphocyte কমে যাওয়া),বুকের X-ray তে নিওমোনিয়া,CRP বেড়ে যাওয়া এবং প্রোক্যালসিটোনিন(Procalcitonin)স্বাভাবিক থাকা।

এবার করোনা ভাইরাসের চিকিৎসায় আসা যাক।সকল ভাইরাসের চিকিৎসার ন্যায় করোনা ভাইরাসের চিকিৎসাও সিমটোমেটিক অর্থাৎ জ্বর,মাথাব্যথা বা শরীর ব্যথার জন্য প্যারাসিটামল সেবন করা,হাঁচি-কাশির জন্য অ্যান্টিহিস্টামিন,গলা ব্যথার জন্য গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে গার্গল করা,পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও সুষম খাদ্য গ্রহণ করা।তবে কোন কোন গবেষণায় Chloroquine বা Hydroxychloroquine কার্যকর বলে দাবি করা হয়েছে এবং FDA(Food and Drug Administration)এর অনুমতিও পেয়েছে। মানবদেহে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে এখনও পর্যন্ত কোন কার্যকর টিকা আবিষ্কৃত না হওয়ায় Self protection ( নিজেকে সুরক্ষিত করা)হলো সবচেয়ে বড় এবং কার্যকর ব্যবস্থা।কাজেই আমাদের সবাইকেই মনে রাখতে হবে জরুরি প্রয়োজন ব্যতীত নিজ নিজ ঘরে অবস্থান করতে হবে,সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে(কমপক্ষে ৩ ফুট বা ২ হাত দূরত্ব),ফেস মাস্ক ব্যবহার করতে হবে(সার্জিকাল ফেস মাস্ক রোগী ও রোগের জীবাণু বহনকারীগণ অর্থাৎ ক্যারিয়ারদের জন্য,N-95 ফেস মাস্ক স্বাস্হ্য সেবা প্রদানকারীগণ ব্যবহার করবে,ডাস্ট মাস্ক সকল সুস্হ মানুষ ব্যবহার করবে,এতে করে সার্জিকাল মাস্ক ও N-95 মাস্কের সংকট কিছুটা হলেও কমে আসবে),সাবান-পানি দিয়ে বারবার কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধুতে হবে, হাত দিয়ে যেন নাক,মুখ ও চোখ বারবার স্পর্শ না করা হয় সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। হাঁচি-কাশি হলে মুখ ও নাক টিস্যু/বাহু/কাপড় দিয়ে ঢেকে নিতে হবে এবং শুধুমাত্র স্বাস্হ্যসেবা প্রদানকারীগণ PPE ব্যবহার করে করোনা রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা সেবা প্রদান করবেন। আসুন আমরা সকলেই সঠিক তথ্য জানি এবং মেনে চলি।ভুল তথ্য শেয়ার যেন না করি কারণ আপনার/আমার একটি ভুল তথ্যই অন্যদের মাঝে অধিক মাত্রায় ভীতির সঞ্চার করে সামাজিক সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে।নিজে সচেতন হই এবং অন্যকেও সচেতন হতে উদ্বুদ্ধ করি এবং করোনা মুক্ত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *